আবার চিকিৎসায় ফিরতে চায় করোনা জয়ী ডা. হেলাল দম্পতি

আতাউর রহমান: নিজেদের দেহে থাকা করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে চিকিৎসক হেলাল উদ্দিন বলছিলেন, বাসায় তাদের পাশের কক্ষে তিন মাস বয়সী একমাত্র আদরের সন্তান মাতৃদুগ্ধের জন্য কান্না করছিল। ওর মা ছেলের কাছে যেতে পারেননি, বাবা হিসেবে তিনিও সন্তানকে কোলে তুলে নিতে পারেননি। খাবারের জন্য নিজের সন্তানের কান্না অসহনীয় লাগছিল।

হেলাল উদ্দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমউ) ডেন্টাল ফ্যাকাল্টির গবেষণা সহকারী পথে কর্মরত। তার স্ত্রী নাজিয়া মেহেনাজ জ্যোতি একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। গত ১৮ এপ্রিল করোনাভাইরাসের পরীক্ষায় তাদের দু’জনের দেহেই পজিটিভ আসে। এরপর তারা বাসাতেই চিকিৎসা নিয়ে গত ৪ মে সুস্থ হন। ব্যাকুল হয়ে উঠলেও গোটা সময়টাতেই তারা একমাত্র সন্তানের কাছে যেতে না পারার কথাই বলছিলেন।

এই চিকিৎসক দম্পতি করোনাযুদ্ধে জয়ী হয়ে এখন নিজেদের কর্মস্থলে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তারা।

ডা. হেলালের দেহে ভাইরাস শনাক্তের আগে পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে নিজের কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। চলমান সংকটে কেন্দ্রীয় যুবলীগের উদ্যোগে জরুরি টেলিমেডিসিন সার্ভিসের তিনি প্রধান সমন্বয়ক। সংগঠনটির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-সম্পাদক এবং ওরাল হেলথ ফাউন্ডেশনের কোষাধ্যক্ষ হওয়ায় তিনি সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণসহ নানা কর্মসূচিতেও যোগ দিয়েছিলেন। তবে তার স্ত্রী মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় বাসাতেই অবস্থান করছিলেন।

ডা. হেলাল বলছিলেন, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ‘ফেসভিউ ডেন্টাল’ নামে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখলেও তা দুই মাস আগেই বন্ধ করে দেন। তবে বিএসএমএমইউতে নিজের বিভাগে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। বাইরে নানা কর্মসূচিতে গেছেন। শেষের দিকে রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় একটি সুপার স্টোরে বাজার করতে যান। তিনি ধারণা করছেন, এই তিন স্থানের কোনোটি থেকেই তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। পরে তার দেহ থেকে স্ত্রীর শরীরেও তা সংক্রমিত হয়।

তিনি বলেন, ১৮ এপ্রিল তার জ্বর-কাশিসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। তিনি টেস্ট করালে ভাইরাস পজিটিভ আসে। পরে স্ত্রী-সন্তানের ভাইরাস টেস্ট করালে স্ত্রীর দেহে পজিটিভ আসে। এর পরই তারা দ্রুত হোম আইসোলেশনে চলে যান। বাসায় থেকেই চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলতে থাকেন। ডায়াবেটিস থাকায় তার শঙ্কাটা আরও বেশি ছিল। একমাত্র শিশুসন্তান নিয়েও ছিলেন নানা উৎকণ্ঠায়।

হেলাল দম্পতি বলেন, অসুস্থতা নিয়ে তারা মানুষকে সার্বক্ষণিক টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে গেছেন। সব সময় মনে করেছেন, তাদের মতোই কেউ বিপদে পড়ে ফোনে স্বাস্থ্যসেবা চাচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী তারা পরপর দু’বার করোনা টেস্ট করালে সর্বশেষ ৪ এপ্রিল তা নেগেটিভ আসে। এখন তারা কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবারও নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ফিরে স্বাস্থ্যসেবা দিতে চান। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত কোনো মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে প্লাজামা থেরাপি দিতেও তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

মানুষকে অভয় দিয়ে তারা বলছিলেন, বাসায় থেকেও সুস্থ হওয়া যায়। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ মানতে হবে। বেশি বেশি প্রোটিন ও ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খেতে হবে। গরম পানি পানের পাশাপাশি সম্ভব হলে হাল্ক্কা ব্যায়ামও করা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। মনোবল শক্ত রাখতে হবে এবং পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দরকার হবে। যা তারা অসুস্থকালীন নিজেদের প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী ও সংগঠন থেকে পেয়েছেন।

হেলাল দম্পতি থাকেন রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায়। তাদের সুস্থতার খবরে বাসার সামনে স্থানীয়রা ভিড় করেন। এলাকার লোকজন বাসার নিচে হাততালি দিয়ে তাদের জন্য শুভকামনাও জানান।