জীবনের ঝুঁকি নিয়ে  রোগীদের সেবায় চিকিৎসক দম্পতিরা

মহিউদ্দিন তুষার: বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) এই কঠিন দুর্যোগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবসেবায় ব্রত রয়েছেন চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসক দম্পতিরা। তারা সবকিছু ভুলে নিজেদের মানুষের সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন। দিনরাত নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর থেকেই মৃত্যুকে পরোয়া না করে ভয়কে জয় করে এই চিকিৎসক দম্পতিরা রোগীদের যথাযথ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ডা: খালেদ শওকত আলী ও তার সহধর্মিনী ডা. তানিয়া খালেদ সার্বক্ষনিক নড়িয়াবাসীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। ৭১ ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র ঢাকার মহাখালীতে সপ্তাহে চার দিন নিরলস দায়িত্ব পালন শেষে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় মাজেদা হাসপাতলে প্রতি বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত রোগী দেখেন তারা। ডা. তানিয়া শওকত বলেন, করোনাভাইরাস মহামারি ও দুর্যোগকালে দায়িত্ব পালন করছি মানবতার দায় থেকে। কোন প্রাপ্তির আশা না করে সুবিধা বঞ্চিত সাধারণ মানুষের পাশে থেকে করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি। ডা. খালেদ শওকত আলী বলেন, মানবতার সেবায় আমি একজন সৈনিক। আমার পিতা-মাতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে তাদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছে। আমি তাদের সন্তান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কন্যার ডাকে করোনা নিয়ন্ত্রণে যুদ্ধ করছি। ফেসবুক গ্রুপে নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছি। নিশ্চিত করছি চিকিৎসা সেবা।

কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও যুবলীগ টেলি মেডিসিন সার্ভিসের প্রধান সমন্বয়ক ডা. হেলাল উদ্দিন ও তার সহধর্মিনী সহকারী অধ্যাপক ডা. নাজিয়া মেহেনাজ জ্যোতি। তারা দু’জনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল ফ্যাকাল্টির কর্মরত চিকিৎসক। করোনাকালে অন্যের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেরাই করোনা আক্রান্ত হয়। পরে বাসায় থেকেই করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেন দুজন। করোনা থেকে সুস্থ্য হয়ে ফের কাজে নেমে পড়েন। এ যেন এক মানবিকতার পরিচয়। ডা. হেলাল বলেন, মানবসেবার ব্রত নিয়ে চিকিৎসা পেশায় এসেছি। এ পেশা সংগ্রামের পেশা। কোন প্রাপ্তির আশায় নয়, সেবার মানসিকতা থেকে এ দায়িত্ব পালন। দেশের এমন মহাসংকটকালে সংগ্রামী পেশার মানুষ হিসেবে পালিয়ে থাকলে রক্ষা পাওয়া যাবে না। পুরো পৃথিবী করোনা ভাইরাস নামের অদৃশ্য শত্রু সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। এ যুদ্ধে আমাদের দেশকে জয়ী হতে হবে।  ডা. নাজিয়া মেহেনাজ জ্যোতি বলেন, মানবসেবা ব্রতের এই পেশার সৈনিক আমরা। জাতির এমন সংকটময় মুহূর্তে পালিয়ে যেতে পারি না। এটা আমাদের পেশাকে অসম্মান ও বিশ্বাসঘাতকতা করার শামিল। তাই যথাসম্ভব সচেতন থেকে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি।

ডা. সফিকুল ইসলাম সুমন স্যার সলিমউল্লাহ মেডিকেল কলেজ এন্ড মিটফোর্ড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। তার সহধর্মিনী ডা. ফারজানা মাহমুদ টিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনডোর মেডিকেল হিসাবে কর্মরত আছেন। দুজনই করোনাকালীন যুদ্ধা। তাদের ঘরে ছোট্ট দুই কন্যা সন্তান রেখে দুজনই আছেন মানব সেবায়। নিজেদের জীবন বাজি রেখে সন্তানদের মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত করে দেশের জন্য কাজ করা এ যেন এক অন্য উদারন। ডা. সফিকুল ইসলাম সুমন বলেন, সন্তান দুটির দিন যেকোন ভাবে কেটে যায়। রাত হলেই যত বিপদ! একদিকে সন্তানের মা বাচ্চা ছাড়া হোটেলে কান্নাকাটি করে আর বাচ্চা রাতে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে। আর আমি হাসপাতাল এবং হোটেল যাওয়া আসার কারনে পাশের রুম থেকে তা দেখে হজম করি! বাবা কিংবা স্বামীদের কান্নার কোন সুযোগ নেই! তাদের কান্নার সাক্ষী একমাত্র উপরওয়ালা। তবে দেশের এ দুর্যোগকালে দায়িত্ব পালন করছি পেশার দায় থেকে কোনো প্রাপ্তির আশায় নয়। এ সময়ে সাধারণ রোগীদের কথা আমাদের ভাবতে হচ্ছে। ডা. ফারজানা মাহমুদ টিনা, দেশের কল্যাণে মানবতার সেবক হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। দুজনে একসঙ্গে আমৃত্যু মানবতার সেবা করে যাবো।

ডাঃ আলমগীর হোসেন কুর্মিটোলা হাসপাতালে এসিসটেন্ট রেজিস্টারে দায়িত্বে আছেন। গত কয়েকবছর ধরে কুর্মিটোলা ৫০০ শয্য বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দ্বায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নিষ্ঠার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কখনো রাত ২ টা কখনো ভোর হাসিমুখেই নিজের দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবার পরিজনের কথা ভুলে করোনার এই মহামারীল সময় প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে এতটুকুও পিছুপা হননি। তার সহধর্মিনী ডাঃ লিমিয়া ছাদিনা মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছেন শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে। করোনা ভাইরাসের এই সময় তিনিও ছেড়েছেন পরিবার পরিজন। দ্বায়িত্ব নিয়েছেন দেশকে মহামারীর হাত থেকে রক্ষার। তাদের ঘরে দুই ছেলে সন্তান। সাড়ে তিন বছরের বড় ছেলে থাকেন ঢাকায় তার নানা-নানীর সাথে। দেড় বছরের ছোট ছেলে তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে থাকেন দাদা-দাদির সাথে। দুজনই পিতা-মাতার আদর থেকে বঞ্চিত। ডাঃ আলমগীর হোসেন বলেন, আমার ছোট দুই ছেলে। বড় ছেলে সাড়ে তিন বছরের আর ছোট ছেলে দেড় বছরের। আমরা বাবা-মা কেউ তাদেরকে ওরকম দেখার সুযোগ পাই নাই। তাদের দাদা-দাদী, নানা-নানীরাই দেখে রাখছেন। দেশের জন্য এটা আমাদের সেক্রিফাইস! দেশবাসী করোনা থেকে মুক্ত পাক মহান আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনাই করবো। সব কিছু স্বাভাবিক হলে আবারও আমরা একসাথে থাকবো ইনশাআল্লাহ।