ভিন্ন অনুভূতির এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা

মোঃ জামাল মল্লিক : তরুণ লেখক রনি রেজার গল্পের বই ‘এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা’। পুরো বই যেন একটা রহস্যের স্তূপ। বহুল জনপ্রিয় ‘অ্যাভাটার’ চলচ্চিত্রের একটি চরিত্র অবলম্বনে স্বরজিতের আঁকা প্রচ্ছদটি প্রথম দর্শনেই কাছে টানবে। নীলচে ছবিটার দিকে তাকালেই রহস্য এসে ভর করবে পাঠক হৃদয়ে। ইচ্ছে হবে একবার ছুঁয়ে দেখার। প্রচ্ছদ, নাম দেখে মনে হবে বইটি শিশুতোষ অথবা সায়েন্স ফিকশন। কিন্তু মলাট ওল্টালেই দেখা যাবে বইয়ের ধরন হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে ‘গল্পগ্রন্থ’। অর্থাৎ এটি শিশু-কিশোরদের বই নয়। আবার সায়েন্স ফিকশনও নয়। তাহলে এমন নামকরণ এবং প্রচ্ছদ কেন? প্রশ্ন জন্মাতেই পারে। এ প্রশ্নের জট খুলতে হলে গল্পগুলো পড়তে হবে। আমিও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই বইটি পড়তে শুরু করি। শেষও করি একটানে। আসলে গল্পগুলোয় আটকে ছিলাম।

প্রতিটি গল্পেই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ছড়ানো রয়েছে; যা ছেড়ে ওঠার সাধ্য কম পাঠকেরই থাকে। বইয়ের প্রথম গল্প ‘নিয়ন্ত্রণ’। এ গল্পের মূল চরিত্র সৈয়দ ফিরোজ হোসেন অদ্ভুত রকমের এক জ্ঞানপিপাসু। তিনি জ্ঞান সন্ধানী। তবে বই পড়তে তার ভালো লাগে না। সে মানুষ পড়তে জানে বলে দাবি করে। তাইতো আড্ডাটাই তার বেশি প্রিয়। আর এই আড্ডাবাজ মানুষটির সঙ্গে লেখক ভিনগ্রহের এক এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ানোর মধ্যে গল্পটি এগিয়ে নিয়েছেন।

কিন্তু গল্পটি পুরো শেষ করার আগ পর্যন্ত কেউ-ই বুঝবে না আড্ডায় কোনো এলিয়েন আছে। এমনকি আড্ডাবাজ ফিরোজ হোসেনও বুঝতে পারে না। সাবলীলভাবে সাহিত্য রসে টইটম্বুর গল্পটি এগিয়ে যায় আর পাঁচটি গল্পের মতোই। চমকটা ছিল শেষে। ফিরোজ হোসেন যখন বুঝতে পারে কিছুক্ষণ আগে একটি এলিয়েনের সঙ্গে তার আড্ডা হয়েছে, রোমাঞ্চ হয়েছে; তখন আর কিছু করার নেই। কিছু করার থাকে না পাঠকেরও। শুধু এগিয়ে যেতে হয় পরবর্তী গল্পের দিকে। এই যে রহস্যের মধ্য দিয়ে বাস্তব জীবনের কথা তুলে ধরা; এটি আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ফ্ল্যাপে স্থান পাওয়া ভারতীয় কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামীর লেখাটি পড়েই। তিনি লিখেছেন, ‘এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা’ নামেই কেমন রহস্য ছড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, রহস্যময় ভঙ্গিতেই চারপাশের কথাগুলো তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে। পাঠক যখন তার বর্ণনা পড়বে সব দৃশ্যই চেনা লাগবে। যেন কল্পনার ডালিতে সাজিয়েছেন আমার কথাগুলোই। এখানেই লেখকের মুনশিয়ানা। এখানেই তিনি জীবনের শাশ্বত সত্যকে উদ্ঘাটিত করেছেন। অনন্তকে ছুঁয়ে থাকা জলোচ্ছ্বাসের কাছে নিজেকে নিবেদনের মধ্যে থাকে আনন্দ। সীমাহীন বিপুলের কাছে মানুষ তো ভিখারি। এই ভিখারিপনা আসলে পূর্ণতারই দ্যোতক। নিজেকে দান করে পূর্ণ হয়ে ওঠার প্রয়াস। মাত্র ১০টি গল্পে সাজানো এই গল্প সংকলন। গল্পগুলোর পাঠের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক সহজেই লেখকের অন্তর্জগতের ক্রমাগত ভাঙন অনুভব করবেন। এই ভাঙন অন্ধকারের নয়। এই বিচ্ছিন্নতা ব্যাপ্তির উল্লাস। নিজের ভেতর থাকা ব্যাপ্তিবোধের ব্যুহ ভেঙে লেখক এখানে গতিমান জীবনের আলেখ্য লিখেছেন।’ ফ্ল্যাপের কথাটি এখানে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, আমি পুরো বই পাঠের সময় কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। ১০টি গল্পে ১০ রকমের স্বাদ মাখিয়ে রেখেছেন লেখক। বার্তাও ভিন্ন ভিন্ন। তবে এক জায়গায় মিল মনে হয়েছে। তা হচ্ছে, প্রতিটি গল্পের শেষ দিকেই একেকটা চমক রেখেছেন। নতুন লেখকদের গল্প পড়ার সময় একটা বিষয়ে আমি বরাবরই সচেতন থাকি। লেখক কার প্রতি প্রভাবিত বোঝার চেষ্টা করি। এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা পড়ার সময়ও এ সচেতনতা পিছু ছাড়েনি। কিন্তু না। শেষ পর্যন্ত একটি গল্পেও কারো কোনো প্রভাব বিশেষভাবে পেলাম না। একটিবারের জন্যও মনে হয়নি কোনো নতুন লেখকের গল্প পড়ছি। এত সাবলীল বর্ণনা। ঘটনার বাঁক নেওয়া, মেপে মেপে সাহিত্যের রস ঢেলে দেওয়া; লেখকের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।