রাজনীতির জগতের দুই দিকপাল ‘রাজ্জাক-তোফায়েল’

আমার মনে হয় পাঠকগণ রাজনীতিবিদ, কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের জীবন কাহিনী জানার ব্যাপারে তুলনামূলক একটু বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন। কারণ তাঁদের সাথে সাধারণ মানুষের ভালোমন্দ বিভিন্ন ভাবেই জড়িয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের মনের কথাগুলো কবি সাহিত্যকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে যেমন তুলে ধরেন, তেমনি রাজনীতিবদিরা সাধারণ মানুষের অধীকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই- সংগ্রাম করে থাকেন। এজন্যে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ, ভালোবাসা অনেক বেশি প্রবল থাকে। রাজনীতি জগতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র আব্দুর রাজ্জাক -তোফায়েল আহমেদ। জাতির কাছে মনে হতো ‘রাজ্জাক-তোফায়েল’ একই বৃত্তে দু’টি ফুল। এ দু’টি ফুলের সুবাতাস ভয়ে গিয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশে। তাঁরা দু’জনই ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহধন্য। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি নির্দেশ তাঁরা পালন করতেন একাগ্রচিত্তে। তাঁরা দু’জন ছিলেন ষাট দশকের তূখোর ছাত্রনেতা। দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তাঁদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। একসঙ্গে ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আব্দুর রাজ্জাক পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের দুইবারের যেমন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তেমনি তোফায়েল আহমেদও ছিলেন ঢাকসুর ভিপি। আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ‘৬- দফা আন্দোলনের মহানয়ক। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ‘৬৯ -গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক। এমনি করেই তাঁরা আজীবন রাজনীতির পিচ্ছিল পথগুলো হেটেঁছেন এবং একের পর এক মাথায় পড়েছেন বিজয়ের মুকুট। আব্দুর রাজ্জাক আজ আমাদের মাঝে নেই। রেখেছেন তাঁর দীর্ঘময় কর্মে অর্জিত কৃতীগুলো। তাঁর সব জীবন স্মৃতিতো আর এত স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করা সম্ভব না। ৩০ শে অক্টোবর আব্দুর রাজ্জাক এর স্মৃতিধন্যে পবিত্র ডামুড্যার মাটিতে গিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, তোফায়েল আহমেদ। এই জাতীয় নেতার আগমন উপলক্ষ্যে ডামুড্যাতে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় পথ হাটা জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ’কে এক নজর দেখার জন্য হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত, নিম্ম মধ্যবিত্ত, করুণ কেরাণী, নারী আর খেটে খাওয়া মানুষগুলো। তোফায়েল আহমেদ যখন তাঁর সহধর্মীনী ও পুত্র বিপ্লব এবং প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক এর সহধর্মীনীকে নিয়ে ডামুড্যা উপজেলা মাঠে হেলিকাপ্টার অবতরণ করেছেন। তখন মাঠে ও মাঠের আনাচে -কানাচে জেগে ওঠা (কম- বেশি ২০ থেকে ২৫ হাজার) মানুষের হাততালি আর শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়েছিল ডামুড্যার মাটি।

জনতার বাধভাঙ্গা উল্লাসের মধ্যদিয়ে প্রথমেই তিনি কলেজের নতুন একাডেমিক ভবন উদ্বোধন করে সরাসরি মঞ্চে এসে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআন ও গীতা পাঠের পর শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন পূর্ব মাদারীপুর সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল মোঃ জহিরুল্লাহ। এরপর ইতিহাসধর্মী বক্তব্যের মাধ্যমে শরীয়তপুরের উন্নয়ন এবং আব্দুর রাজ্জাক -তোফায়েল আহমেদকে তুলে ধরেন শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক বাবু অনল কুমার দে। তার পরেই বক্তব্য দেন শরীয়তপুর জেলা পুলিশ সুপার আবদুল মমিন এবং সুধী সমাবেশের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী মোঃ আবু তাহের। তিনি দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি অত্যন্ত সাবলিল ভাবে তুলে ধরেন। এরপরেই বক্তব্য দেন, শরীয়তপুর -৩ আসনের মানুষ যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন এবং যে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে মাথার গাম ঝড়য়ে দীপ্ত পায়ে হেটে সমবেত হয়েছেন ঐতিহাসিক কলেজ মাঠ চত্বরে। ওই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন একটাই সেটা হলো তাঁদের প্রতিনিধি প্রিয় নেতার উচ্চ শিক্ষিত পুত্র নাহিম রাজ্জাকই থাকবেন। এর বাইরে অন্যকিছু তারা কল্পনায়ই আনতে চায় না। এটার অবশ্য অনেক কারণও আছে। ওই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের প্রথম দাবীদার অবশ্যই বাংলার গণমানুষের প্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। এরপর আমাদের জাতীয় কিংবদন্তি নেতা জননেতা আব্দুর রাজ্জাকের।

শরীয়তপুরের উন্নয়নে আব্দুর রাজ্জাক এর অবদান যুগান্তকারী। সেই মহান নেতা ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর লন্ডনের কিংকস কলেজ হসপিটালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পর নাহিম রাজ্জাক পিতার আদর্শ বুকে লালন করে আরামের ঘুম হারাম করে পিতার অসামাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য অবিরাম পথ চলতে থাকেন। করা নাড়েন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে। বাবার অধীকার নিয়ে হাজির হন পিতৃসম মন্ত্রী মহোদয়দের নিকট। সীমাহীন আন্তরিকতা নিয়ে এলাকার উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখার চেষ্ঠা করেন। পরিশ্রমের মূল্য ওই অঞ্চলের মানুষ ইতোমধ্যে দেওয়া শুরুও করেছেন। একটি উপজেলা পর্যায়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম। এটা নিংসন্দেহে নির্মোহ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ মানুষের ভালবাসার চেয়ে আর বড় কিছু আছে বলে জানা নেই। নাহিম রাজ্জাকও পছন্দ করেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে এবং সে কাজগুলোই তিনি করে যাচ্ছেন। নাহিম রাজ্জাকের বক্তব্য ছিল খুবই আবেগঘন এবং সংক্ষিপ্ত। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তার দায়িত্বকালীন সময়ে যেভাবে একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এলাকায় নিয়ে বিচরণ ঘটিয়েছেন এটা নিংসন্দেহে বিরল ঘটনা। এটা জাতীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক এর সন্তান বলেই সম্ভব হয়েছে।

এর পরেই বক্তব্য দেন প্রধান অতিথি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সফল বাণিজ্যমন্ত্রী জননেতা তোফায়েল আহমেদ, এমপি। তিনি প্রথমেই গভীর শ্রদ্ধা নিবেন করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবির রহমান, বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও ১৫ ই আগস্টের সকল শহীদদের স্মৃতির প্রতি। গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা প্রিয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক এর স্মৃতির প্রতি এবং ১৯৭১ সালের সকল শহীদদের প্রতি। বক্তব্যের শুরুতেই সহযোদ্ধার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বিশাল জনসমুদ্র রীতিমত স্তব্ধ হয়ে যায়। পথ হাটা মানুষগুলো থমকে দাঁড়ায়। প্রধান অতিথির সাথে কেউ কেউতো অঝরেই কেঁদেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রায় পুরো বক্তব্যই ছিল কান্না জড়িত। মন্ত্রীর সাথে জনতাও কেঁদেছে। আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে তাঁর স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা বলেছে আবেগময় হয়ে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “নাহিম আমার আদরের সম্মু। নাহিম রাজ্জাকের ধমনীতে রাজ্জাক ভাইয়ের রক্ত। ও খুবই বুদ্ধিমান ছেলে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নাহিমকে বেশ পছন্দ করেন। এই যুগে সততা, নিষ্ঠা বজায় রেখে চলা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। নাহিম ইতোমধ্যে এই এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছেন যা আমরাও পারি নাই। ওকে আপনাদের হাতে সর্পদ করে গেলাম। আপনারা তাকে লালন – পালন করে বড় করবেন। নাহিম একদিন অনেক বড় হবে রাজ্জাক ভাই’র মতো আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারেরও উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন চমৎকার ভাবে। নেত্রীর অসম সাহসীকতার ফসল আপনাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্যও তিনি দোয়া চেযেছেন উপস্থিত জনতার কাছে। গত ২৯ তারিখে নেত্রীর ভাষণের স্মৃতিচারণ করে মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেন, গতকাল ২৯ তারিখ নেত্রীর সংসদে শেষ উক্তি ছিল, ” আবার আসিব ফিরে ধান সিড়িঁটির তীরে, আবার আসিব ফিরে এই সংসদে”। তদরুপ আমিও বলি, আবার আসিব ফিরে এই ডামুড্যার তীরে “। আল্লাহ হাফেজ, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

৩০ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলায় শরীয়তপুরের আকাশে সবচাইতে উজ্জ্বলতম তারকা জাতীয় বীর, জাতীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাকের নামে ‘টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে’, , মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, ডামুড্যা পৌরসভা ‘খ’ থেকে ‘ক’ শ্রেণীতে উন্নীতকরণ ও নতুন পৌরসভা ভবনের ভবনের শুভ উদ্বোধন করেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অনঢ়তম নেতৃত্বদানকারী তোফায়েল আহমেদ।

লেখক: বোরহান উদ্দিন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, ডামুড্যা উপজেলা আওয়ামী লীগ।