সারাদেশ যখন লকডাউন: সখিপুরে জেলে-আড়ৎ ব্যবসায়ীদের তখন ‘চানরাত’

মহিউদ্দিন তুষার: দেশজুড়ে চলছে লকডাউন। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারি-বেরসকারি সহ জরুরি ব্যবস্থা ছাড়া সব কিছু বন্ধের ঘোষণা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে সবাইকে ঘরে থেকে সাহায্য করার অনুরোধ করেছেন। সেই লকডাউনের সময় শরীয়তপুর জেলাধীন সখিপুর থানায় পদ্মা-মেঘনা নদীতে চলছে জাটকা ইলিশ ধরার মহোৎসব। প্রজনন মৌসুমে জাটকা ইলিশ নিধন রোধে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দাম বেশি পাওয়ার আশায় জেলেরা কোনো নির্দেশ মানছেন না।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীগুলোতে নির্বিচারে জাটকা ইলিশ ধরছেন জেলেরা। প্রতিদিন শিকার করা হচ্ছে হাজার হাজার মণ জাটকা। আর এ জাটকা বিক্রিতে সহায়তা করছে স্থানীয় আড়ৎ ব্যবসায়ীরা। শহর থেকে বন্ধের ছুটিতে বাড়ী আসা লোকজন ভিড় জমিয়েছে নদীর পাড়ে। দৃর্শ দেখে মনে হয় এ যেন ঈদের পূর্বের রাত।

জাটকা সংরক্ষণে পহেলা মার্চ থেকে দুই মাসের জন্য সব ধরণের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের ৬টি অভয়াশ্রমের নদনদীগুলোতে। ফলে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলেরা নদীতে কোন মাছ ধরতে পারবেন না। এ সময় অভয়াশ্রম এলাকায় জাটকা ধরা, বেচাকেনা এবং বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

জানা যায়, আড়ৎ ব্যবসায়ীদের নেপথ্যেই বেশিরভাগ জেলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাটকা ইলিশ শিকার করছে। আড়ৎ থেকে টলার, রিকশা ও ভ্যানে ফেরি করে গ্রামের পাশাপাশি বিক্রি করা হচ্ছে বাজারগুলোতেও। নতুন করে যোগ হয়েছে শহর থেকে আসা লোকজন।

সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কাঁচিকাটার মান্দারতলি মরিচা কান্দিতে কাঁচিকাটা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক রুস্তম আলী সরকারের নেতৃত্বে চলে একটি আড়ৎ। তার সাথে সহযোগী রয়েছে আলম মোল্লা, রিপন বেপারী, ইবু মোল্লা ও আনোয়ার মোল্লা।

বাদশা সরদারের নেতৃত্বে রয়েছে আরেকটি আড়ৎ। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে কাঁচিকাটা ইউনিয়ন ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার নিজাম সরদার, নোকমান গাজী, বিল্লাল বেপারী, ডালিম এবং সাইফুল ইসলামসহ প্রায় ১০-১২ জন।

সাই ফেক্টরী পাশে রয়েছে ২টি আড়ৎ। একটির নেতৃত্ব দেয় রিয়াজ মো: রাজ। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন সুরুজ্জামান হাওলাদার, নিজাম খাঁসহ আরও কয়েকজন। এখানে নিজাম হাওলাদারের নেতৃত্বে চলে আরেকটি আড়ৎ।

তারাবুনিয়া স্টেশন ঘাটে রয়েছে-হোসেন হাওলাদার, হোসেন দেওয়ান, বাচ্চু প্রধানিয়া, শানু মোল্লা। দুলারচর ঘাটে সোনামিয়া দেওয়ানের নেতৃত্বে একটি আড়ৎ সাথে রয়েছে সহযোগী একাধিক ব্যক্তি। এছাড়া চিরারচর, লগ্গিমারাতে রয়েছে একাধিক আড়ৎ। আড়ৎগুলো সন্ধ্যা রাতের পর থেকে শুরু করে চলে সকাল পর্যন্ত।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, নৌ-ফাঁড়ি ও থানা পুলিশের সহযোগিতায় আড়ৎরা ব্যবসা করছে এবং জেলেরা ইলিশ শিকার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা বেশকিছু নৌকা ও আড়ৎ থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করছে জানা যায়। যার ফলে ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নৌ-পুলিশের একটি দল মৎস্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে না জানিয়ে নদীতে নামে। জেলেদের আটকের পর তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। একই আতাত করছে আড়ৎ ব্যবসায়ীদের সাথে।

নাম প্রকাশে অনিশ্চিক এক জেলে জানান, আড়ৎ থেকে নৌ-পুলিশ নিয়মিত টাকা নিয়ে থাকে। এছাড়া জেলেদের জাল ও ইলিশ মাছ জব্দ করে। পরে ১০/১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

একাধিক জেলে জানান, আড়ৎ ব্যবসায়ীরা জেলেদের অগ্রিম টাকা দিয়ে নদীতে নামায় এবং পুলিশ আকট করলে ছাড়িয়ে রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে থাকে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীন-আল-নাসীফ বলেন, অবৈধভাবে যারা নদীতে মাছ ধরছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই মোবাইল কোর্ট, জেল জরিমান হয়ে আসছিলো। দেশের এমন ক্রান্তিকাল সময় প্রশাসেনর লোকজন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। যারা এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাথে আড়ৎ বাবসায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমটি/ এআর