একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান

মহিউদ্দিন তুষার: পুলিশ-শব্দটা শুনলেই কেমন যেন একটা নেগেটিভ ধারনা কাজ করে আমাদের দেশের মানুষের মনে। পুলিশ যে একটা পেশার পদবি তা ভুলে যায়। বরং মনে হয় পুলিশ সমাজের একটা ভিন্ন প্রজাতি। তবে এর পেছনে এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বে আইনি কার্যক্রম অনেকটা দায়ী। দেশের মূল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে বুঝায় পুলিশ বাহিনীকে। কিন্তু অপরাধ রোধ করতে গিয়ে এ পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য তার সততা বা নিষ্ঠার জায়গাতে অনেক ক্ষেত্রে অনড় থাকতে পারেনা। আর সে কারনে মন্দ পুলিশের আড়ালে হারিয়ে যায় ভালো পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জের সদ্যসাবেক এসপি হারুন অর রশিদও সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন। তাই প্রবল প্রতাপশালী এসপি থেকে তিনি এখন ওএসডি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিচার কাজ প্রায় শেষের দিকে। এতো গেল মন্দদের কথা।

এর আগে ২০১৭ সালে দিনটি ছিলো শুক্রবার বেলা ১১টা। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের গৌরীপুরে প্রায় ৩০ থেকে ৩৪ জন যাত্রী নিয়ে মতলবগামী বাস ‘মতলব এক্সপ্রেস’ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে ডোবায় পড়ে যায়। এ সময় গৌরীপুরে দায়িত্বরত ছিলেন দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার কনস্টেবল পারভেজ মিয়া। তিনি গৌরীপুরে ডিউটি করাকালীন সময় হাইওয়ে রোডের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে ডোবায় পড়ে গেছে। সে সাথে–সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পঁচা ও গন্ধযুক্ত ময়লা ডোবার পানিতে তাৎক্ষণিক লাফিয়ে পড়েন। যাত্রীদের প্রান বাঁচাতে তিনি প্রথমে দ্রুত গাড়ির জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে দেন। জানালা ভেঙে দিলে গাড়ির ভিতরে থাকা যাত্রীরা সহজে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ কনস্টেবল পারভেজের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতায় কুমিল্লার দাউদকান্দিতে প্রাণে বেঁচে গেছে দুর্ঘটনা কবলিত একটি বাসের অন্তত ৩০ থেকে ৩৪ জন যাত্রী। সেই সাহসিকতার বড় পুরস্কার পেয়েছেন কনস্টেবল পারভেজ। হাইওয়ে রেঞ্জ ডিআইজি কর্তৃক ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার পান তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় বাস খাদে পড়ে দুই জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ২৫ জন। এর মধ্যে হতাহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন- ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের সিড্যা গ্রামের নুরুজ্জামান মুন্সীর ছেলে কামরুজ্জামান মাহমুদ মুন্সী (৪৫), দক্ষিণ ডামুড্যা গ্রামের তমিজউদ্দিন পাইকের ছেলে ইয়াকুব পাইক (৮০) ও ডামুড্যা পৌরসভার কুলকুড়ি গ্রামের খালেক মোল্যার ছেলে জুলহাস মোল্যা (২৮)।

দুর্ঘটনার সাথে সাথেই স্থানীয় লোকজন উদ্ধার কাজে নেমে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পৌছে যায় ডামুড্যা থানা প্রশাসনের কাছে। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন থানার ওসি সহ অন্যান্য প্রশাসন। থানার লোকজন ঘটনাস্থলে এসে দেখেন স্থানীয়রা  মৃত্যু ব্যাক্তি সহ হতাহতদের পাড়ে তুলছে। এই করুণ দৃর্শ দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনি ডামুড্যা থানার ওসি মেহেদী হাসান। গায়ে পড়া ইউনিফর্ম সহ ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধার কাজে। খাদে পড়া বাসটিতে কোন লোক আটকে আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি উদ্ধার কাছে সকলের সাথে সাহায্য করেন।

থানার কনস্টেবল এবং স্থানীয় লোকজন থাকা সত্বেও কেন নিজে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে জানতে চাইলে ওসি মেহেদী হাসান বলেন, সবার উপরে মানুষ সত্ব, তাহার উপরে নাই। আমিও সবার মত একজন মানুষ। ঘটনাস্থলে এসে এমন দৃর্শ দেখার পর নিজেকে আর স্থীর রাখতে পারলাম না। নিজের দায়বদ্ধতা থেকেই উদ্ধার কাজে নেমে পড়ি। আমি মনে করেছি এটা আমার দায়িত্ব।

বর্তমানে সাধারণ মানুষ ভয়ে পুলিশকে এড়িয়ে চলে। কারণ পুলিশ চাইলে যখন তখন, যেকোনো মানুষকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। তার হাতে অস্ত্র আছে, তার হাতে আইন আছে। পুলিশ চাইলে নিছক সন্দেহের কারণেই যে কাউকে আটক করতে পারে। এছাড়া প্রায় সব মামলাতেই অজ্ঞাতনামা কিছু আসামি থাকে। পুলিশ চাইলে যে কাউকেই যেকোনো মামলার অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেফতার করতে পারে। তাছাড়া পুলিশের নিয়ে যাওয়া মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল দিয়ে কাউকে গ্রেফতার করার ঘটনাও সবাই জানেন, কিন্তু চ্যালেঞ্জ করার উপায় থাকে না কারও। রাস্তায় মোটরসাইকেল আটকে পকেটে গাঁজা বা ইয়াবা দিয়ে হয়রানিও করছে পুলিশ। এই পুলিশদের মধ্যেই আবার কেউ কেউ মানবতার ফেলিওয়ালা হয়ে মানুষের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহেদী হাসানরা। মেহেদী হাসানরা সংখ্যায় কম। কালের পরিক্রমায় হয়তো ফিকে হয়ে যাবে সব-ই। বেঁচে তাকবে মানবতা।